মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় চিত্রনায়িকা পরীমনির দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় রিমান্ড মঞ্জুরের কারণ জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। কিসের ভিত্তিতে ওই দুই দফা রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছিল, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা জানিয়ে ঢাকার দুটি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে ১০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে নথিসহ (কেস ডকেট) ১৫ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 


বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন। দেরিতে জামিন আবেদন শুনানির তারিখ নির্ধারণ নিয়ে পরীমনি হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। এর শুনানিতে পরীমনিকে রিমান্ড নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। 


ওই মামলায় দ্বিতীয় দফায় ১০ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবব্রত বিশ্বাস এবং তৃতীয় দফায় ১৯ আগস্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম ওই রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। হাইকোর্ট বলেছেন, ব্যাখ্যার জবাব সন্তোষজনক না হলে তাঁদের আদালতে উপস্থিত হতে নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।


মামলাটি তদন্ত করছেন পুলিশ পরিদর্শক কাজী গোলাম মোস্তফা। আদালত বলেছেন, রিমান্ড চাওয়ার কারণ ও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে ১৫ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তাকে আসতে হবে। 


আদালত বলেন, নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ও আইন লঙ্ঘন করে বেআইনি পন্থায় অভিযুক্ত পরীমনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এভাবে নাগরিকের অধিকার বেআইনি পন্থায় খর্ব করা যায় না। একইভাবে প্রতিটি নাগরিকের আইন ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি অনুগত থাকতে হয়। বর্তমান মামলায় যে পন্থায় তাঁকে (পরীমনি) গ্রেপ্তার, আদালতে হাজির এবং হাজিরের পর চার দিনের জন্য রিমান্ডে পাঠানো হয়, তাতে অভিযুক্তর নিরাপত্তা ও অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। 


সংবিধানের ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করে আদালত বলেন, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না কিংবা কারও সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না।

আদালত বলেন, সুষ্ঠু ও স্বাধীন তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই স্বীকার করতে হয়। বর্তমান মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডের আবেদন করেন। গত ১০ ও ১৯ আগস্ট রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন মঞ্জুরের আগে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে সন্তুষ্ট হলেন? প্রথম দফায় চার দিন রিমান্ডের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা এমন কী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাদান পেলেন যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সংবিধান ও অন্যান্য আইনি বিধিবিধান লঙ্ঘন করে তদন্ত কর্মকর্তার করা রিমান্ড আবেদনে ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে রিমান্ড মঞ্জুর করলেন, তা বোধগম্য নয়। 

ঘটনা ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে ঘোষিত আদেশে বলা হয়, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (দুজন) কারণ ব্যাখ্যা করবেন, কিসের ভিত্তিতে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলো। 

আদালত আরও বলেন, অপরাধ এককভাবে পুলিশের জন্য সমস্যা নয়, সমাজের সমস্যা। কারও রিমান্ড চাওয়ার আগে পুলিশ কর্মকর্তাকে আইনি ও মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রথমে চিন্তা করতে হবে। সিডিসহ তদন্ত কর্মকর্তাকে ১৫ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির হতে বলা হলো। পরবর্তী আদেশের জন্য ১৫ সেপ্টেম্বর দিন রাখা হলো। 

এর আগে আদালতে পরীমনির পক্ষে আইনজীবী মো. মজিবুর রহমান শুনানি করেন। আসকের নির্বাহী সদস্য ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না শুনানি করেন, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী সৈয়দা নাসরিন ও মো. শাহীনুজ্জামান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান। এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবু ইয়াহিয়া দুলাল ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন। 


সহকারী অ্যার্টনি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান শুনানিতে বলেন, প্রথমে ম্যাজিস্ট্রেট চারদিন রিমান্ড দেন। একদিন রিমান্ডের পর বিষয়টি তদন্তের জন্য সিআইডিতে যায। রিমান্ডে একদিন ডিবির হাতে ও পরের তিনদিন সিআইডির কাছে থাকে। ১০ আগস্ট রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হয়। তখন তারা দুদিন রিমান্ড চান, যেখানে বলা কিছু গুরুত্বপূর্ন তথ্য পাওয়া গেছে ও উনি কিছু ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন। সেদিন ম্যাজিস্ট্রেট দুইদিন রিমান্ড দেন।

এ সময় আদালত বলেন, সিআইডি কাছে তিনদিন ছিল, তারা তো কারা জড়িত তেমন কোনো তালিকা তো দেয়নি। 

তখন সহকারী অ্যার্টনি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান বলেন, যখন একটি বিষয় তদন্তাধীন থাকে, তদন্তের স্বার্থে তারা অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারেন না। তবে তা রেকর্ডে থাকে। দুদিন রিমান্ডে নেওয়ার পর আসামি কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। বিভ্রান্তকর তথ্যের কারণে বাধ্য হয়ে রিমান্ড চাওয়া হয়। একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়, যা জরুরি ছিল।